শিরোনাম :
নিখোঁজের আগের ঘটনা জানালো শিমুর বোন ফাতেমা মনে রাখবেন, জনগণের টাকায় আমাদের সংসার চলে : রাষ্ট্রপতি অপ্রচলিত বাজারে পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ২৪ শতাংশ নির্বাচন কমিশন আইন প্রণয়ন নিয়ে টিআইবির বিবৃতি সূচকের উত্থান-পতনে লেনদেন শেষ বাংলাদেশে করোনায় আরও ১০ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ৮৪০৭ এখনই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের কথা ভাবছি না : শিক্ষামন্ত্রী বিএনপি অবৈধ অর্থ ব্যয়ে লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করেছে : তথ্যমন্ত্রী হত্যার দায় স্বীকার করলেন স্বামী একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু দেখল অস্ট্রেলিয়া ওমিক্রন ঠেকাতে সক্ষম নয় টিকার ৪র্থ ডোজও : গবেষণা দলীয় লোক‌ দিয়ে নির্বাচন ক‌মিশন গঠন আইন কর‌ছে সরকার: নজরুল ১ এপ্রিল মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষা সুদানে সেনাবিরোধী বিক্ষোভে গুলিতে নিহত ৭ ৮ মার্চ খালেদা জিয়ার অভিযোগ গঠনের শুনানি

অনিয়মের ভারে বেহাল রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ পাটকল

  • সোমবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২১
পাটকল

ঢাকা: বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তরের অনুসন্ধানে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় পাট কলে নানা অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। ছবি: সংগৃহীত

বিজেএমএর মহাসচিব আবদুল বারিক খান বলেন, ‘বিজেএমসির দুর্নীতির কারণে পাটকলগুলো বন্ধ হয়েছে। চুরি করে খায়, সরকারি মাল দরিয়া মে ঢাল এমন অবস্থা। বিজেএমসির কারণে পাট শিল্পের আজ এ অবস্থা।’

অনিয়মে বেহাল হয়ে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় পাটকল। আপ্যায়ন ব্যয়ে নয়ছয়, বিধিবহির্ভূত সম্মানি ভাতা উত্তোলন, বৈদেশিক ভ্রমণ ভাতা বিল করে টাকা তুলে নেয়াসহ হয়েছে নানা অনিয়ম।

শুধু ছয় পাটকলই নয়, বিজেএমসির প্রধান কার্যালয়েও আত্মসাৎ হয়েছে অর্থ। সবমিলিয়ে ৭৮ কোটি টাকার অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তর।

সোনালি আঁশ পাট বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় একটি ফসল। স্বাধীনতার পাটই ছিল দেশের প্রধান রপ্তানি ফসল। পরে নানা প্রচেষ্টা এবং চক্রান্তে থমকে যায় পাটের অগ্রযাত্রা। নানা অনিয়মে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর উৎপাদন বাড়েনি। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে কার্যক্রম।

বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএমএ) মহাসচিব আবদুল বারিক খান বলেন, ‘বিজেএমসির দুর্নীতির কারণে পাটকলগুলো বন্ধ হয়েছে। চুরি করে খায়, সরকারি মাল দরিয়া মে ঢাল এমন অবস্থা। বিজেএমসির কারণে পাট শিল্পের আজ এ অবস্থা।’

তিনি বলেন, ‘এখন এ শিল্পকে বাঁচাতে হলে প্রথমে আধুনিক যন্ত্রপাতি প্রয়োজন। যে মেশিনারিজ আছে সেগুলো অনেক পুরোনো। বিজেএমসির অনেক ঋণের সুদ মওকুফ করা হয়েছে। তেমনি পুরো পাটখাতে এ ধরণের সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে।’

আবদুল বারিক খান বলেন, ‘এ শিল্প বাঁচাতে হলে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। স্বল্পসুদে ঋণ দিতে হবে। বিজিএমইএ গার্মেন্ট শিল্প রক্ষা করতে অনেক পলিসি সাপোর্ট দেয়। পাট খাতে এ ধরণের নীতি সহায়তা দিতে হবে।’

পাটকলে অনিয়ম

বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তরের অনুসন্ধানে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় পাট কলে ২০১৬-১৭ এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে নানা অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৭৮ কোটি ৩ লাখ ৪৪ হাজার ৫৩০ টাকা।

বিজিএমসির প্রধান কার্যালয়, বাংলাদেশ জুট মিলস লিমিটেড, ইউএমসি জুট মিলস লিমিটেড, জুটো ফাইবার গ্লাস ইন্ডাস্টিজ, করিম জুট মিলস লিমিটেড, স্টার জুট মিলস লিমিটেড এবং হাফিজ জুট মিলস লিমিটেডে অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে অডিট অধিদপ্তর।

বিজেএমসি কার্যালয়ে অনিয়ম

বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন বা বিজেএমসি কার্যালয়ের অনিয়মে ৪০ লাখ ১০ হাজার টাকার আর্থিক ক্ষতি পেয়েছে অডিট অধিদপ্তর। আপ্যায়ন খাতে প্রকৃত খরচের বদলে বিল ভাউচার ছাড়া খরচ দেখানোর ফলে প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি ৮ লাখ ৪৮ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা।

তিনজন উপদেষ্টাকে বিধিবহির্ভূতভাবে একই সঙ্গে অবসর ভাতা এবং উপদেষ্টা হিসেবে সম্মানি ভাতা দেয়ায় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২৯ লাখ ৩১ হাজার ৪২৯ টাকা। প্রাপ্যের চেয়ে অতিরিক্ত হারে বৈদেশিক ভ্রমণ ভাতা বিল দেয়ায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ২ লাখ ৩০ হাজার ৫২৭ টাকা।

সবচেয়ে বেশি অনিয়ম বাংলাদেশ জুট মিলসে

রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের মধ্যে বড় অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে বাংলাদেশ জুট মিলসে। চারটি খাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৫২ কোটি ৭১ লাখ ৭৫ হাজার ৯৪৭ টাকা।

অডিট অধিদপ্তর বলছে, মার্কেটিং ব্যবস্থাপনার গাফিলতির কারণে ক্রেতা সংগ্রহ না করার ফলে মজুত বেড়ে যাওয়ায় আয় কম হয়েছে। এর ফলে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৪৫ কোটি ৫২ লাখ ৫৩ হাজার ৯১৩ টাকা। বিজেএমসির নিয়ন্ত্রণাধীন মিলগুলোর কাছ থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন ধরণের পাওনা আদায় না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানের ক্ষতির পরিমাণ ৬ কোটি ১২ লাখ ৬৬ হাজার ৫৬১ টাকা।

২০১৭-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত বেতনের বিপরীতে প্রদত্ত অগ্রিম অনাদায়ী অবস্থায় রয়েছে ১৩ লাখ ৪৯ হাজার ৬১৬ টাকা। এছাড়া বিভিন্ন কেনার ক্ষেত্রে কেটে নেয়া ভ্যাট ও আয়কর সরকারি কোষাগারে জমা না দেয়ায় দণ্ড সুদসহ সরকারের রাজস্ব ক্ষতি ৯৩ লাখ ৫ হাজার ৮৫৭ টাকা।

ইউএমসি জুটমিলে টাকা পাননি সরবরাহকারীরা

রাষ্ট্রায়ত্ত ইউএমসি জুটমিলে ১১ কোটি ৭২ লাখ ৬৭ হাজার ৪১৮ টাকার আর্থিক ক্ষতি পেয়েছে বাণিজ্যিক নিরীক্ষা অধিদপ্তর।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পাট বিভাগীয় প্রধান এস এ এইচ মনোয়ার আলী, চুরমুগুরিয়া কেন্দ্রের ইনচার্জ মোজাম্মেল হক, কামারপাড়া কেন্দ্রের ইনচার্জ নুরুল ইসলাম এবং মিলের গোডাউন ইনচার্জ আরিফুল চালান জালিয়াতি করেছেন। বিভিন্ন পাট সরবরাহকারীর বিল পরিশোধ না করে তারা আত্মসাৎ করেছেন ২ কোটি ২৪ লাখ ৮৩ হাজার ৩৯২ টাকা।

মিলে শ্রমিক হাজিরার বিপরীতে অতিরিক্ত শ্রমিকের মজুরি শোধ করায় ক্ষতি ৭৩ লাখ ৬৮ হাজার ৮০০ টাকা। এছাড়া চালু তাঁতের বিপরীতে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে বাজেট বরাদ্দ অপেক্ষা অতিরিক্ত ব্যয় করার ফলে প্রতিষ্ঠানের অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৮৭৮ টাকা।

বিজেএমসি নির্ধারিত হার অপেক্ষা অতিরিক্ত হারে বেলিং বাকেলস খরচ দেখানোর ফলে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৫ লাখ ৮ হাজার ১৪৮ টাকা।

জুটো ফাইবার গ্লাস ইন্ডাস্টিজে অনিয়ম

রাষ্ট্রায়ত্ত জুটো ফাইবার গ্লাস ইন্ডাস্টিজে ১ কোটি ৪০ লাখ ৮৩ হাজার ১২১ টাকার আর্থিক ক্ষতি পেয়েছে বাণিজ্যিক নিরীক্ষা অধিদপ্তর।

ট্রেড ডেবটরস এবং অন্যান্য অগ্রিম বাবদ অর্থ দীর্ঘদিন অনাদায়ী অবস্থায় পড়ে থাকায় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৮৫ লাখ ৮১ হাজার ৩০৭ টাকা। বিভিন্ন অগ্রিম দীর্ঘদিন অনাদায়ী অবস্থায় পড়ে থাকায় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৫৫ লাখ ১ হাজার ৮১৪ টাকা।

করিম জুট মিলে আর্থিক ক্ষতি

রাষ্ট্রায়ত্ত করিম জুট মিলস লিমিটেডে ২ কোটি ৮১ লাখ ২ হাজার ৭৯৮ টাকার আর্থিক ক্ষতি পেয়েছে বাণিজ্যিক নিরীক্ষা অধিদপ্তর।

করিম জুট মিলে তিনটি পুকুর বা জলাশয় লিজ দিয়ে ভ্যাট না কাটায় সরকারের ক্ষতি ৩ লাখ ৬০ হাজার ১৫০ টাকা।

কলতাপাড়া পাট ক্রয় কেন্দ্রের কেনা পাটের পরিমাণের চেয়ে কম পরিমাণ পাট মিলে গ্রহণ করায় হিসাবের গড়মিল ৯৭ লাখ ৫৩ হাজার ৬১৫ টাকা।

প্রাপ্যর অতিরিক্ত হারে বেলিং হুপস ও বেলিং বাকেলস খরচ করায় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৭৩ হাজার ৪৩২ টাকা। সরবরাহকারী ও বিবিধ বিল থেকে কেটে নেয়া উৎসে আয়কর সরকারি কোষাগারে জমা না করায় রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে ২৭ লাখ ৮৮ হাজার ৫ টাকা।

অনুমোদনের বাইরে অতিরিক্ত হারে অধিকাল ভাতা দেয়ায় ক্ষতি হয়েছে ৩৯ লাখ ৮ হাজার ২৭ টাকা। এছাড়া শ্রমিক হাজিরায় অনুমোদনহীন কর্মচারী নিয়োজিত করায় নিরীক্ষা বর্ষেই প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ১২ লাখ ১৯ হাজার ৫৬৯ টাকা।

স্টার জুট মিলে আর্থিক ক্ষতি

রাষ্ট্রায়ত্ত স্টার জুট মিলস লিমিটেডে ৭ কোটি ৭৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪০ টাকার আর্থিক ক্ষতি পেয়েছে বাণিজ্যিক নিরীক্ষা অধিদপ্তর।

চালু তাঁতে অনুমোদিত লোকবল অপেক্ষা অনিয়মিতভাবে মোট ৬ হাজার ২০৮ জন অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ করায় এবং মজুরি দেয়ায় ক্ষতি হয়েছে ৪ কোটি ৪৮ লাখ ৫২ হাজার ৮০০ টাকা।

বিভিন্ন সরবরাহকারীর বিল ও বিবিধ থেকে কেটে রাখা আয়কর ও ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা না দেয়ায় রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে ৪৮ লাখ ৩৬ হাজার ৮২৫ টাকা।

বাজেট বরাদ্দ না থাকা সত্ত্বেও মিলের শ্রমিকদের অধিকার ভাতা স্বাভাবিক হাজিরা হিসেবে দেয়ায় মিলের ক্ষতি হয়েছে ৪৮ লাখ ৫২ হাজার ৮৩৫ টাকা। বিপুল অংকের ব্যাংক ঋণে পরিচালিত মিলের অর্থ থেকে পর্যাপ্ত অগ্রিম দেয়ার পর দীর্ঘদিনেও সমন্বয় না করায় সুদসহ আদায়যোগ্য টাকার পরিমাণ ২ কোটি ৩৩ লাখ ৩৬ হাজার ৫৮০ টাকা।

হাফিজ জুট মিলে অনিয়ম

রাষ্ট্রায়ত্ত হাফিজ জুট মিল লিমিটেডে ১ কোটি ১৮ লাখ ২৬ হাজার ২০৬ টাকার আর্থিক ক্ষতি পেয়েছে বাণিজ্যিক নিরীক্ষা অধিদপ্তর।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্দেশনা লঙ্ঘন করে বছরের পর বছর কেটে নেয়া ভ্যাট, উৎসে আয়কর ও রেভেনিউ স্ট্যাম্প বাবদ প্রাপ্ত সরকারি রাজস্ব কোষাগারে জমা না করায় সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ৬ লাখ ২৩ হাজার ৪৩ টাকা।

আর্থিক অব্যবস্থাপনা ও বিজেএমসির পাটক্রয় নির্দেশনা পালনে ব্যর্থতায় খানখানাপুর পাটক্রয় কেন্দ্রে পাটের মানজনিত ও পরিমাণজনিত আর্থিক ক্ষতির জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় দুই কর্মকর্তা শংকর চন্দ্র সরকার ও সহকারী পাটক্রয় কর্মকর্তার কাছে পাওনা ১২ লাখ ৩ হাজার ১৬১ টাকা।

সংবাটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো খরব
© Copyright © 2017 - 2021 Times of Bangla, All Rights Reserved